ব্রাহ্মণবাড়িয়া তিতাসের বুকে নৌকার ঝড়, হাজারো মানুষের উচ্ছ্বাসে চ্যাম্পিয়ন সদর উপজেলা
এম বাদল খন্দকার (জেলা প্রতিনিধি) ব্রাহ্মণবাড়িয়া
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তিতাস নদীর বুকে উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা-২০২৬। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত এ নৌকা বাইচকে ঘিরে নদীর দুই তীরে নামে হাজারো মানুষের ঢল। আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী এ আয়োজন দেখতে বিভিন্ন বয়সী মানুষ সকাল থেকেই তিতাসের দুই পাড়ে ভিড় করেন।
জেলার নয়টি উপজেলা থেকে প্রতিযোগীরা নৌকা নিয়ে এ বাইচে অংশ নেন। তিতাস নদীর বুকে প্রতিযোগী নৌকাগুলোর পাল্লা দিয়ে ছুটে চলার দৃশ্য দর্শকদের মাঝে সৃষ্টি করে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। প্রতিযোগিতার সময় নদীর দুই পাড়ে দর্শকদের করতালি, উল্লাস ও চিৎকারে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। ঢাক-ঢোলের শব্দ ও উৎসবের আমেজে যেন প্রাণ ফিরে পায় তিতাস নদী।
দিনব্যাপী প্রতিযোগিতা শেষে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার নৌকা দল। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দলগুলোর মাঝেও পুরস্কার বিতরণ করা হয়।
প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জনকারী নৌকা দলকে ২ লাখ টাকা, দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী দলকে দেড় লাখ টাকা এবং তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দলকে ১ লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়া হয়। পরে অতিথিরা বিজয়ী দলগুলোর হাতে ট্রফি ও পুরস্কারের অর্থ তুলে দেন।
বিজয়ী ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার নৌকা দল পুরস্কার গ্রহণের সময় দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখা যায়। চ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য ও সমর্থকদের উল্লাসে মুখর হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল।
পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা পরিষদের প্রশাসক সিরাজুল ইসলাম, পুলিশ সুপার শাহ মো. আব্দুর রউফ, সংসদ সদস্য নাদিয়া রহমান পাপন, জহিরুল হক খোকন, আলী আজম, হাফিজুর রহমান মোল্লা কচি, মোবারক হোসেন, আসাদুজ্জামান শাহীন এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর প্রশাসক শরিফুল ইসলামসহ জেলার বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিবর্গ।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মো. আবছার।
নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা সফল ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সার্বিক সহযোগিতা করেন জেলা বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এছাড়াও ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, সামাজিক সংগঠন ঢেউ, নোঙ্গর, তরী, ঐক্যবদ্ধ ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যরা সহযোগিতায় অংশ নেন।
নৌকা বাইচ চলাকালে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা পালন করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। তিতাস নদী ও নদীর দুই তীরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। পাশাপাশি যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনা মোকাবিলায় প্রস্তুত ছিল ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরাও। প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সমন্বিত সহযোগিতায় শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে প্রতিযোগিতার সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
সকাল থেকেই তিতাস নদীর দুই পাড়ে মানুষের সমাগম বাড়তে থাকে। কেউ পরিবার-পরিজন নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে আবার কেউ দূর-দূরান্ত থেকে নৌকা বাইচ উপভোগ করতে নদীর পাড়ে আসেন। শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে তিতাসের দুই তীর যেন পরিণত হয় এক বিশাল মিলনমেলায়।
আয়োজকদের মতে, নৌকা বাইচ বাংলার হাজার বছরের লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আধুনিকতার যুগে গ্রামীণ সংস্কৃতির এই ঐতিহ্য ধরে রাখা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে আবহমান বাংলার সংস্কৃতি তুলে ধরার লক্ষ্যেই এ আয়োজন করা হয়েছে।
দিনব্যাপী প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণ শেষে সন্ধ্যা পর্যন্ত তিতাস নদীর দুই পাড়ে উৎসবের আমেজ বিরাজ করে। হাজারো মানুষের উচ্ছ্বাস, প্রতিযোগী নৌকাগুলোর দুরন্ত গতি এবং বিজয়ীদের আনন্দে শেষ হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা-২০২৬।