
বাগেরহাটে জলাতঙ্কের ঝুঁকি রোধে বেওয়ারিশ ও গৃহপালিত কুকুরকে টিকাদান কর্মসূচি শুরু
ম.ম.রবি ডাকুয়া,বাগেরহাট
বাগেরহাটে কুকুরের কামড়ে জলাতঙ্ক রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি কমাতে পৌর এলাকায় বেওয়ারিশ ও গৃহপালিত কুকুরকে টিকা দেওয়ার বিশেষ কর্মসূচি শুরু হয়েছে।
বুধবার দুপুরে বাগেরহাট পৌরসভা চত্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে বেওয়ারিশ ও গৃহপালিত কুকুরকে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা দেওয়ার এই গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাগেরহাটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও পৌর প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন, পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মাসুম এবং ভ্যাকসিনেশন বিশেষজ্ঞ ও ডগ এক্সপার্ট টিমের সদস্য সায়মনসহ পৌরসভার বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। মূলত শহরে বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং এর ফলে কুকুরের কামড়ে জলাতঙ্কের মতো মারাত্মক ও প্রাণঘাতী রোগ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তীব্র আকার ধারণ করায় পৌর কর্তৃপক্ষ এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই কর্মসূচির আওতায় শুধু বেওয়ারিশ কুকুরই নয়, বরং গৃহপালিত কুকুরগুলোকেও সুশৃঙ্খলভাবে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকার আওতায় নিয়ে আসা হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কার্যক্রমটি সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য ফেনী থেকে আগত অভিজ্ঞ ‘ডগ এক্সপার্ট টিম’-এর সঙ্গে চুক্তি করেছে বাগেরহাট পৌরসভা, যাদের সদস্যরা পর্যায়ক্রমে পৌর এলাকার প্রতিটি অলিগলি ও জনবহুল স্থান থেকে কুকুর শনাক্ত করে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এই টিকা প্রদান সম্পন্ন করবেন। পৌরসভার এই উদ্যোগের ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরাজমান কুকুরের কামড় ও জলাতঙ্কের আতঙ্ক অনেকটাই হ্রাস পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার এই উদ্যোগের পেছনের মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বাগেরহাটের ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের উদ্বেগজনক চিকিৎসাসেবা পরিসংখ্যান, যা পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ তা স্পষ্ট করে দেয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রদান করা তথ্য অনুযায়ী, বিগত মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে অন্তত সাত হাজার পাঁচশ মানুষ কুকুরের কামড়ের শিকার হয়ে এই হাসপাতালে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা গ্রহণ করেছেন। এই পরিসংখ্যান কেবল বেওয়ারিশ কুকুরের উপদ্রবই বাড়ায়নি, বরং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাফেরা ও দৈনন্দিন নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক নীরব সংকট তৈরি করেছে। ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় সচেতন মহলের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল শহরের বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং তাদের জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকার আওতায় আনা। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের টিকা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করে যে, কেবল মৌখিক সচেতনতা নয়, বরং মাঠপর্যায়ে কঠোর ও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা কতটা জরুরি ছিল। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কুকুরকে টিকাদানের এই চলমান কার্যক্রমের পাশাপাশি কুকুরের কামড়ের শিকার হওয়া মানুষদের জন্য দ্রুততম সময়ে উন্নত চিকিৎসা এবং পর্যাপ্ত টিকা নিশ্চিত করার বিষয়টিও সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে, অন্যথায় জনস্বাস্থ্যের এই ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হবে না।
বাগেরহাট পৌরসভার এই জনকল্যাণমুখী কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট সকল মহলের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেলেও এর টেকসই বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। পৌরসভার সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ ও ডগ এক্সপার্ট টিমের সমন্বিত প্রচেষ্টায় যদি পৌর এলাকার প্রতিটি কুকুরকে এই টিকাদানের আওতায় নিয়ে আসা যায়, তবে কুকুরের কামড়ের মাধ্যমে মানুষের দেহে জলাতঙ্ক ছড়ানোর আশঙ্কা জিরো টলারেন্সে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে। তবে এই কার্যক্রমকে শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ না রেখে নিয়মিত মনিটরিং এবং পর্যায়ক্রমিক সম্প্রসারণের মাধ্যমে জেলাজুড়ে বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত বাঞ্ছনীয়। স্থানীয় প্রশাসন ও পৌর কর্তৃপক্ষের এই উদ্যোগ সফল হলে তা দেশের অন্যান্য পৌরসভার জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে, যেখানে প্রাণীর টিকাদানের মাধ্যমে সরাসরি মানুষের জীবন রক্ষা করার একটি স্থায়ী রূপরেখা তৈরি হয়েছে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এই ধরনের বহুমুখী পদক্ষেপের যথাযথ বাস্তবায়নই পারে বাগেরহাটবাসীকে জলাতঙ্কের মতো একটি আতঙ্কের রোগ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখতে এবং নিরাপদ একটি নগরজীবন উপহার দিতে।
এই কর্মসূচির সফল সমাপ্তি ও কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জনের জন্য স্থানীয় জনগণের সচেতন অংশগ্রহণ এবং সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। পৌরসভার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, নির্ধারিত টিমগুলোর কার্যক্রম চলাকালীন সাধারণ নাগরিকরা যেন কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি না করেন এবং প্রয়োজনে প্রশাসনকে সহযোগিতা করেন। সামগ্রিকভাবে, বাগেরহাটে শুরু হওয়া এই জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকাদান কর্মসূচি কেবল একটি পশুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নয়, বরং এটি পুরো অঞ্চলের জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। এই ধরনের জনগুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ভবিষ্যতে কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভিড় জমানোর চিত্রটি উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে এবং একটি সুস্থ, নিরাপদ ও রোগমুক্ত সমাজ গঠনে এই পদক্ষেপ এক সুদূরপ্রসারী ও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।